Dhaka ০৩:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকিও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদিগকে সুবিচার প্রতিষ্ঠা হইতে বিরত না রাখে। সুবিচার কর; ইহাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এবং আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় তোমরা যাহা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৩১:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
  • ২৯ Time View

[সূরা মায়িদাহ :আয়াত ৮]

#সূরা মায়িদাহ :আয়াত ৮

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

“হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকিও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদিগকে সুবিচার প্রতিষ্ঠা হইতে বিরত না রাখে। সুবিচার কর; ইহাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এবং আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় তোমরা যাহা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”

[সূরা মায়িদাহ :আয়াত ৮]

মানবসমাজের ইতিহাসে অধিকাংশ অন্যায়ের মূলেই রহিয়াছে পক্ষপাত, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষ। মানুষ যখন প্রেমে অন্ধ হয়, তখন সত্যকে বিস্মৃত হয়; আবার যখন ঘৃণায় আচ্ছন্ন হয়, তখন ন্যায়বিচারের পাল্লা তাহার হস্ত হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়ে। এইজন্যই আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বিশ্বাসিগণের হৃদয়ের প্রতি সম্বোধন করিয়া এমন এক নৈতিক আদর্শ স্থাপন করিয়াছেন, যাহা কেবল ধর্মীয় বিধান নহে—ইহা মানবসভ্যতার বিবেক।
“তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকিও”— এই নির্দেশের মধ্যে মুমিন জীবনের এক মহৎ দায়িত্ব নিহিত আছে। সত্যের সাক্ষ্য কেবল আদালতের কাঠগড়ায় সীমাবদ্ধ নহে; মানুষের প্রতিদিনের বাক্য, আচরণ, বিচার ও সিদ্ধান্ত—সমস্তই এক একটি সাক্ষ্য। মানুষ যখন সত্য জানিয়াও ভয়ে নীরব থাকে, অথবা স্বার্থের কারণে সত্য গোপন করে, তখন সে ন্যায়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি আপন স্বজনের বিরুদ্ধেও সত্য উচ্চারণ করিতে পারে, সে-ই আল্লাহর নিকট সত্যসাক্ষী।
আয়াতের কেন্দ্রীয় বাণী এইখানে—
“কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদিগকে সুবিচার প্রতিষ্ঠা হইতে বিরত না রাখে।”
মানব-হৃদয়ের জন্য ইহা এক কঠিন পরীক্ষা। কারণ মানুষ সাধারণত তাহাকেই ন্যায় দেয়, যাহাকে সে ভালোবাসে; আর যাহাকে ঘৃণা করে, তাহার প্রতি অবিচার করাকে অনেক সময় ন্যায্য বলিয়া মনে করে। কিন্তু কুরআনের শিক্ষা ভিন্ন। ইসলাম মানুষের আবেগকে অস্বীকার করে না, কিন্তু আবেগের হাতে ন্যায়ের তরবারি সমর্পণ করিতেও অনুমতি দেয় না। শত্রুও যদি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে তাহার সহিত ন্যায় করাই মুমিনের কর্তব্য। কারণ ন্যায়বিচার প্রতিপক্ষের প্রতি অনুগ্রহ নহে; ইহা আল্লাহর বিধান।
“সুবিচার কর; ইহাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী”—
এই বাক্যে কুরআন যেন মানবধর্মের অন্তর্গত এক গভীর সত্য উদ্ঘাটন করিয়াছে। তাকওয়া কেবল দীর্ঘ নামাজ, দীর্ঘ দোয়া কিংবা বাহ্যিক ধার্মিকতার নাম নহে। প্রকৃত তাকওয়া সেই হৃদয়ে জন্মে, যে হৃদয় ক্রোধের মুহূর্তেও ন্যায়ের সীমা লঙ্ঘন করে না; প্রতিশোধের সুযোগ পাইয়াও অন্যায়কে বরণ করে না। যে ব্যক্তি ক্ষমতার আসনে বসিয়াও ন্যায়ের ভারসাম্য রক্ষা করে, সেই প্রকৃত আল্লাহভীরু।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা মানুষকে স্মরণ করাইয়া দেন—
“নিশ্চয় তোমরা যাহা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”
অর্থাৎ পৃথিবীর আদালতকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হইতে পারে, কিন্তু বিবেক ও রবের আদালতকে নয়। মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য, অন্তরের প্রতিটি গোপন অভিপ্রায়, বিচারকের প্রতিটি পক্ষপাত, শাসকের প্রতিটি অন্যায়—সবই আল্লাহর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। এই উপলব্ধিই মানুষের অন্তরে প্রকৃত ন্যায়বোধ জাগ্রত করে।
এই আয়াত কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নহে; ইহা মানবসভ্যতার জন্য এক চিরন্তন নৈতিক ঘোষণা—
ঘৃণার মধ্যেও ন্যায়, শত্রুতার মধ্যেও সত্য, এবং ক্ষমতার মধ্যেও বিবেক অক্ষুণ্ণ রাখিবার ঐশ্বরিক আহ্বান। 

See less

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বরিশালে চাঁদা না পেয়ে মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা

“হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকিও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদিগকে সুবিচার প্রতিষ্ঠা হইতে বিরত না রাখে। সুবিচার কর; ইহাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এবং আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় তোমরা যাহা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”

Update Time : ০৭:৩১:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

[সূরা মায়িদাহ :আয়াত ৮]

#সূরা মায়িদাহ :আয়াত ৮

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

“হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকিও। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদিগকে সুবিচার প্রতিষ্ঠা হইতে বিরত না রাখে। সুবিচার কর; ইহাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। এবং আল্লাহকে ভয় কর; নিশ্চয় তোমরা যাহা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”

[সূরা মায়িদাহ :আয়াত ৮]

মানবসমাজের ইতিহাসে অধিকাংশ অন্যায়ের মূলেই রহিয়াছে পক্ষপাত, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষ। মানুষ যখন প্রেমে অন্ধ হয়, তখন সত্যকে বিস্মৃত হয়; আবার যখন ঘৃণায় আচ্ছন্ন হয়, তখন ন্যায়বিচারের পাল্লা তাহার হস্ত হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়ে। এইজন্যই আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বিশ্বাসিগণের হৃদয়ের প্রতি সম্বোধন করিয়া এমন এক নৈতিক আদর্শ স্থাপন করিয়াছেন, যাহা কেবল ধর্মীয় বিধান নহে—ইহা মানবসভ্যতার বিবেক।
“তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়পরায়ণতার সহিত সাক্ষ্যদানে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকিও”— এই নির্দেশের মধ্যে মুমিন জীবনের এক মহৎ দায়িত্ব নিহিত আছে। সত্যের সাক্ষ্য কেবল আদালতের কাঠগড়ায় সীমাবদ্ধ নহে; মানুষের প্রতিদিনের বাক্য, আচরণ, বিচার ও সিদ্ধান্ত—সমস্তই এক একটি সাক্ষ্য। মানুষ যখন সত্য জানিয়াও ভয়ে নীরব থাকে, অথবা স্বার্থের কারণে সত্য গোপন করে, তখন সে ন্যায়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি আপন স্বজনের বিরুদ্ধেও সত্য উচ্চারণ করিতে পারে, সে-ই আল্লাহর নিকট সত্যসাক্ষী।
আয়াতের কেন্দ্রীয় বাণী এইখানে—
“কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদিগকে সুবিচার প্রতিষ্ঠা হইতে বিরত না রাখে।”
মানব-হৃদয়ের জন্য ইহা এক কঠিন পরীক্ষা। কারণ মানুষ সাধারণত তাহাকেই ন্যায় দেয়, যাহাকে সে ভালোবাসে; আর যাহাকে ঘৃণা করে, তাহার প্রতি অবিচার করাকে অনেক সময় ন্যায্য বলিয়া মনে করে। কিন্তু কুরআনের শিক্ষা ভিন্ন। ইসলাম মানুষের আবেগকে অস্বীকার করে না, কিন্তু আবেগের হাতে ন্যায়ের তরবারি সমর্পণ করিতেও অনুমতি দেয় না। শত্রুও যদি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে তাহার সহিত ন্যায় করাই মুমিনের কর্তব্য। কারণ ন্যায়বিচার প্রতিপক্ষের প্রতি অনুগ্রহ নহে; ইহা আল্লাহর বিধান।
“সুবিচার কর; ইহাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী”—
এই বাক্যে কুরআন যেন মানবধর্মের অন্তর্গত এক গভীর সত্য উদ্ঘাটন করিয়াছে। তাকওয়া কেবল দীর্ঘ নামাজ, দীর্ঘ দোয়া কিংবা বাহ্যিক ধার্মিকতার নাম নহে। প্রকৃত তাকওয়া সেই হৃদয়ে জন্মে, যে হৃদয় ক্রোধের মুহূর্তেও ন্যায়ের সীমা লঙ্ঘন করে না; প্রতিশোধের সুযোগ পাইয়াও অন্যায়কে বরণ করে না। যে ব্যক্তি ক্ষমতার আসনে বসিয়াও ন্যায়ের ভারসাম্য রক্ষা করে, সেই প্রকৃত আল্লাহভীরু।
অতঃপর আল্লাহ তাআলা মানুষকে স্মরণ করাইয়া দেন—
“নিশ্চয় তোমরা যাহা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।”
অর্থাৎ পৃথিবীর আদালতকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হইতে পারে, কিন্তু বিবেক ও রবের আদালতকে নয়। মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য, অন্তরের প্রতিটি গোপন অভিপ্রায়, বিচারকের প্রতিটি পক্ষপাত, শাসকের প্রতিটি অন্যায়—সবই আল্লাহর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। এই উপলব্ধিই মানুষের অন্তরে প্রকৃত ন্যায়বোধ জাগ্রত করে।
এই আয়াত কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নহে; ইহা মানবসভ্যতার জন্য এক চিরন্তন নৈতিক ঘোষণা—
ঘৃণার মধ্যেও ন্যায়, শত্রুতার মধ্যেও সত্য, এবং ক্ষমতার মধ্যেও বিবেক অক্ষুণ্ণ রাখিবার ঐশ্বরিক আহ্বান। 

See less