Dhaka ০২:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মৃতির অমলিন পার্থিব প্রান্তর থেকে অনন্তলোকের অভিযাত্রী প্রিয় নাজিম স্যার!

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:৪২:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
  • ১২৭ Time View

সমাজসচেতন, মননশীল ও গভীর পর্যবেক্ষণশক্তিসম্পন্ন একজন আদর্শ শিক্ষক নাজিম স্যার।

মানুষের জীবনে কিছু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের উপস্থিতি কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়, কিন্তু গভীর। তাঁরা শব্দের চেয়ে বেশি শেখান নীরবতায়, শাসনের চেয়ে বেশি গড়ে তোলেন মমতায়। সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান, জীবনের অগণিত ব্যস্ততা কিংবা দূরত্ব—কিছুই তাঁদের স্মৃতিকে মুছে দিতে পারে না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়, জীবনের ভেতরে কত গভীর ছাপ রেখে গেছেন তাঁরা। পিরুজালী উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক জনাব নাজি উদ্দিন স্যার ছিলেন তেমনই এক মানুষ—একজন শিক্ষক, যিনি শুধু অঙ্ক শেখাননি; শিখিয়েছেন জীবনকে ভাবতে, সমাজকে বুঝতে, মানুষ হয়ে উঠতে।
আজ তিনি নেই। দয়াময় প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে অনন্তলোকে যাত্রা করেছেন। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদ যেন হঠাৎ করেই মনের ভেতর বহুদিনের জমে থাকা স্মৃতির দরজাগুলো খুলে দিল। মনে পড়ছে ১৯৯৭ সালের কথা। তখন আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। কৈশোরের সেই দিনগুলোতে গণিত ছিল আমার কাছে কখনো ভয়ের, কখনো চ্যালেঞ্জের এক বিষয়। সেই সময় নাজিম স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার সুযোগ হয়েছিল। একই গ্রাম—পাইনশাইল। গ্রামের পরিচিত পরিবেশ, মাটির গন্ধ, আর তার মাঝখানে এক নিরহংকার শিক্ষক—আজও সেই দৃশ্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে।
স্যারের কাছে পড়তে যাওয়ার মধ্যে এক ধরনের আলাদা অনুভূতি ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনের মানুষ; কিন্তু তাঁর চিন্তার পরিধি ছিল অসাধারণ বিস্তৃত। অঙ্ক শেখানোর সময় তিনি শুধু সূত্র মুখস্থ করাতে চাইতেন না। তিনি চাইতেন ছাত্র বুঝুক। বোঝার আনন্দটাই যেন তাঁর কাছে ছিল আসল শিক্ষা। কোনো ছাত্র ভুল করলে তিনি বিরক্তির চেয়ে ধৈর্যকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁর চোখেমুখে এক ধরনের মমতা ছিল, যা ছাত্রকে ভয়ের বদলে সাহস দিত।
আমাদের সমাজে গণিত শিক্ষক মানেই অনেক সময় কঠোর, গম্ভীর ও দূরত্ব বজায় রাখা একজন মানুষ। কিন্তু নাজিম স্যার ছিলেন ভিন্ন। তাঁর ভেতরে ছিল সহজ এক মানবিকতা। হয়তো সেই কারণেই ছাত্ররা তাঁকে শুধু শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন অভিভাবক হিসেবেও দেখত। তিনি জানতেন, একটি কিশোর মনকে গড়ে তোলা শুধু বইয়ের দায়িত্ব নয়; সেখানে প্রয়োজন সহানুভূতি, মূল্যবোধ আর চিন্তার স্বাধীনতা।
জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে কত দূরে নিয়ে যায়! একসময় স্কুলজীবন শেষ হয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবন—সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কগুলো সময়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। তবু কিছু মানুষ হঠাৎ করেই আবার সামনে এসে দাঁড়ান, আর মনে হয়—সময়ের ব্যবধান আসলে কিছুই নয়।
গেল রমাযান মাসের সেই সকালটি আজ বারবার মনে পড়ছে। সকাল প্রায় এগারোটার দিকে আমি পিরুজালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখি, স্কুলের মেইন গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন নাজিম স্যার। বয়সের ছাপ তখন শরীরে স্পষ্ট, কিন্তু চোখের ভেতরের সেই চিরচেনা দীপ্তি তখনও অমলিন। আমি সালাম দিলাম। স্যার তাঁর স্বভাবসুলভ মুচকি হাসি দিয়ে জবাব দিলেন। পান-রাঙা ঠোঁটের সেই হাসি আজও আমার চোখে ভাসছে। আমি তাঁকে অটোতে উঠার অনুরোধ করলাম। তিনি উঠলেন। আর অল্প কিছু সময়ের সেই পথচলাই আজ মনে হচ্ছে জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি।
কথার ভেতর উঠে এলো তাঁর চাকরিজীবনের প্রসঙ্গ। অবসরের আগে এলপিআর-এ যাওয়ার এখনো প্রায় সাড়ে তিন বছর বাকি। কিন্তু কথার আসল গভীরতা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি সমাজের চলমান অনিয়ম, অবক্ষয় ও নৈরাজ্য নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক ধরনের বেদনা—যেন একজন শিক্ষক তাঁর প্রিয় সমাজটিকে ধীরে ধীরে মূল্যবোধ হারাতে দেখছেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকতা বিষয়ে আমাকে যেভাবে উৎসাহ ও উপদেশ দিচ্ছিলেন, তাতে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম।
সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম—নাজিম স্যার কেবল গণিতের শিক্ষক নন। তিনি ছিলেন সমাজসচেতন, মননশীল এবং গভীর পর্যবেক্ষণশক্তিসম্পন্ন একজন মানুষ। তিনি বুঝতেন সমাজের ভাঙন কোথায়, তরুণদের দায়িত্ব কী, এবং সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতার প্রয়োজন কতখানি। একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবেন, তখন তিনি কেবল শিক্ষক থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন আলোকবর্তিকা।
আজ মনে হচ্ছে, সেদিনের সেই সংক্ষিপ্ত কথোপকথন যেন ছিল এক নীরব বিদায়। মানুষ তো জানে না, কোন দেখা শেষ দেখা হয়ে যাবে। তাই আজ সেই মুচকি হাসি, সেই কথাগুলো, সেই উপদেশ—সবকিছু বুকের ভেতর এক গভীর শূন্যতা তৈরি করছে।
শিক্ষকরা আসলে কখনো পুরোপুরি চলে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের ছাত্রদের স্মৃতিতে, আচরণে, চিন্তায়। একজন সত্যিকারের শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের ভেতরে নিজের কিছু অংশ রেখে যান। হয়তো কোনো কঠিন সময়ে হঠাৎ তাঁর শেখানো কথা মনে পড়ে যায়। হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে তাঁর উপদেশ পথ দেখায়। এভাবেই শিক্ষকরা সময়ের সীমা অতিক্রম করে বেঁচে থাকেন।
নাজিম স্যার ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের জীবনের সাফল্য বড় পদ বা প্রচারে নয়; মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ায়। তিনি হয়তো কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, সংবাদপত্রের শিরোনামও হননি। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি বহু ছাত্রের জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন। গ্রামের সাধারণ পরিবেশে থেকেও তিনি চিন্তার যে গভীরতা ধারণ করতেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই দেখি, মানুষ জ্ঞান অর্জন করছে, কিন্তু প্রজ্ঞা হারাচ্ছে। তথ্য বাড়ছে, কিন্তু মানবিকতা কমছে। এই সময়ের মধ্যে নাজিম স্যারের মতো মানুষরা ছিলেন এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ। তাঁরা প্রমাণ করতেন—একজন শিক্ষক শুধু পেশাজীবী নন; তিনি সমাজ নির্মাণের কারিগর।
মৃত্যু মানুষের চিরন্তন সত্য। কিন্তু কিছু মৃত্যু হৃদয়ের ভেতরে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি তোলে। নাজিম স্যারের মৃত্যু তেমনই এক বেদনার নাম। মনে হচ্ছে, গ্রামের আকাশ থেকে যেন এক পরিচিত আলোর প্রদীপ নিভে গেল। স্কুলের সেই গেট, গ্রামের সেই পথ, কিংবা কোনো বিকেলের নিস্তব্ধতা—সবকিছুতেই এখন তাঁর অনুপস্থিতি অনুভূত হবে।
তবু সান্ত্বনা একটাই—তিনি সম্মানের সঙ্গে বেঁচেছিলেন এবং ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? ছাত্রদের হৃদয়ে যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তিনি রেখে গেছেন, সেটিই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার।
আজ তাঁর বিদেহী আত্মার জন্য গভীর মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাআলা জনাব নাজি উদ্দিন স্যারকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন, নূরে ভরিয়ে দিন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আমরা যারা তাঁর ছাত্র ছিলাম, কিংবা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে তাঁর সংস্পর্শে এসেছি—তাঁদের হৃদয়ে নাজিম স্যার আজীবন বেঁচে থাকবেন। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যাবে, নতুন মানুষ আসবে, নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে; কিন্তু কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু উপদেশ কখনো হারিয়ে যায় না।
নাজিম স্যারও হারিয়ে যাবেন না।
তিনি থেকে যাবেন—
মমতাময় হাসিতে,
প্রেরণাদায়ী কথাতে

পাইনশাইল টু পিরুজালী গ্রামের স্মৃতিময় পথে,
আর তাঁর শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞ হৃদয়ে।

স্যারের স্নেহধন্য ছাত্র

মোঃ আলফাজ উদ্দিন

গণ সাংবাদিক ও নাগরিক লেখক

সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বরিশালে চাঁদা না পেয়ে মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা

স্মৃতির অমলিন পার্থিব প্রান্তর থেকে অনন্তলোকের অভিযাত্রী প্রিয় নাজিম স্যার!

Update Time : ০৫:৪২:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

সমাজসচেতন, মননশীল ও গভীর পর্যবেক্ষণশক্তিসম্পন্ন একজন আদর্শ শিক্ষক নাজিম স্যার।

মানুষের জীবনে কিছু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের উপস্থিতি কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়, কিন্তু গভীর। তাঁরা শব্দের চেয়ে বেশি শেখান নীরবতায়, শাসনের চেয়ে বেশি গড়ে তোলেন মমতায়। সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান, জীবনের অগণিত ব্যস্ততা কিংবা দূরত্ব—কিছুই তাঁদের স্মৃতিকে মুছে দিতে পারে না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়, জীবনের ভেতরে কত গভীর ছাপ রেখে গেছেন তাঁরা। পিরুজালী উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক জনাব নাজি উদ্দিন স্যার ছিলেন তেমনই এক মানুষ—একজন শিক্ষক, যিনি শুধু অঙ্ক শেখাননি; শিখিয়েছেন জীবনকে ভাবতে, সমাজকে বুঝতে, মানুষ হয়ে উঠতে।
আজ তিনি নেই। দয়াময় প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে অনন্তলোকে যাত্রা করেছেন। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদ যেন হঠাৎ করেই মনের ভেতর বহুদিনের জমে থাকা স্মৃতির দরজাগুলো খুলে দিল। মনে পড়ছে ১৯৯৭ সালের কথা। তখন আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। কৈশোরের সেই দিনগুলোতে গণিত ছিল আমার কাছে কখনো ভয়ের, কখনো চ্যালেঞ্জের এক বিষয়। সেই সময় নাজিম স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার সুযোগ হয়েছিল। একই গ্রাম—পাইনশাইল। গ্রামের পরিচিত পরিবেশ, মাটির গন্ধ, আর তার মাঝখানে এক নিরহংকার শিক্ষক—আজও সেই দৃশ্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে।
স্যারের কাছে পড়তে যাওয়ার মধ্যে এক ধরনের আলাদা অনুভূতি ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনের মানুষ; কিন্তু তাঁর চিন্তার পরিধি ছিল অসাধারণ বিস্তৃত। অঙ্ক শেখানোর সময় তিনি শুধু সূত্র মুখস্থ করাতে চাইতেন না। তিনি চাইতেন ছাত্র বুঝুক। বোঝার আনন্দটাই যেন তাঁর কাছে ছিল আসল শিক্ষা। কোনো ছাত্র ভুল করলে তিনি বিরক্তির চেয়ে ধৈর্যকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁর চোখেমুখে এক ধরনের মমতা ছিল, যা ছাত্রকে ভয়ের বদলে সাহস দিত।
আমাদের সমাজে গণিত শিক্ষক মানেই অনেক সময় কঠোর, গম্ভীর ও দূরত্ব বজায় রাখা একজন মানুষ। কিন্তু নাজিম স্যার ছিলেন ভিন্ন। তাঁর ভেতরে ছিল সহজ এক মানবিকতা। হয়তো সেই কারণেই ছাত্ররা তাঁকে শুধু শিক্ষক হিসেবে নয়, একজন অভিভাবক হিসেবেও দেখত। তিনি জানতেন, একটি কিশোর মনকে গড়ে তোলা শুধু বইয়ের দায়িত্ব নয়; সেখানে প্রয়োজন সহানুভূতি, মূল্যবোধ আর চিন্তার স্বাধীনতা।
জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে কত দূরে নিয়ে যায়! একসময় স্কুলজীবন শেষ হয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবন—সবকিছু মিলিয়ে সম্পর্কগুলো সময়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। তবু কিছু মানুষ হঠাৎ করেই আবার সামনে এসে দাঁড়ান, আর মনে হয়—সময়ের ব্যবধান আসলে কিছুই নয়।
গেল রমাযান মাসের সেই সকালটি আজ বারবার মনে পড়ছে। সকাল প্রায় এগারোটার দিকে আমি পিরুজালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখি, স্কুলের মেইন গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন নাজিম স্যার। বয়সের ছাপ তখন শরীরে স্পষ্ট, কিন্তু চোখের ভেতরের সেই চিরচেনা দীপ্তি তখনও অমলিন। আমি সালাম দিলাম। স্যার তাঁর স্বভাবসুলভ মুচকি হাসি দিয়ে জবাব দিলেন। পান-রাঙা ঠোঁটের সেই হাসি আজও আমার চোখে ভাসছে। আমি তাঁকে অটোতে উঠার অনুরোধ করলাম। তিনি উঠলেন। আর অল্প কিছু সময়ের সেই পথচলাই আজ মনে হচ্ছে জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি।
কথার ভেতর উঠে এলো তাঁর চাকরিজীবনের প্রসঙ্গ। অবসরের আগে এলপিআর-এ যাওয়ার এখনো প্রায় সাড়ে তিন বছর বাকি। কিন্তু কথার আসল গভীরতা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি সমাজের চলমান অনিয়ম, অবক্ষয় ও নৈরাজ্য নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক ধরনের বেদনা—যেন একজন শিক্ষক তাঁর প্রিয় সমাজটিকে ধীরে ধীরে মূল্যবোধ হারাতে দেখছেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকতা বিষয়ে আমাকে যেভাবে উৎসাহ ও উপদেশ দিচ্ছিলেন, তাতে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম।
সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম—নাজিম স্যার কেবল গণিতের শিক্ষক নন। তিনি ছিলেন সমাজসচেতন, মননশীল এবং গভীর পর্যবেক্ষণশক্তিসম্পন্ন একজন মানুষ। তিনি বুঝতেন সমাজের ভাঙন কোথায়, তরুণদের দায়িত্ব কী, এবং সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতার প্রয়োজন কতখানি। একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে ভাবেন, তখন তিনি কেবল শিক্ষক থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন আলোকবর্তিকা।
আজ মনে হচ্ছে, সেদিনের সেই সংক্ষিপ্ত কথোপকথন যেন ছিল এক নীরব বিদায়। মানুষ তো জানে না, কোন দেখা শেষ দেখা হয়ে যাবে। তাই আজ সেই মুচকি হাসি, সেই কথাগুলো, সেই উপদেশ—সবকিছু বুকের ভেতর এক গভীর শূন্যতা তৈরি করছে।
শিক্ষকরা আসলে কখনো পুরোপুরি চলে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের ছাত্রদের স্মৃতিতে, আচরণে, চিন্তায়। একজন সত্যিকারের শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের ভেতরে নিজের কিছু অংশ রেখে যান। হয়তো কোনো কঠিন সময়ে হঠাৎ তাঁর শেখানো কথা মনে পড়ে যায়। হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে তাঁর উপদেশ পথ দেখায়। এভাবেই শিক্ষকরা সময়ের সীমা অতিক্রম করে বেঁচে থাকেন।
নাজিম স্যার ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের জীবনের সাফল্য বড় পদ বা প্রচারে নয়; মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ায়। তিনি হয়তো কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, সংবাদপত্রের শিরোনামও হননি। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি বহু ছাত্রের জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন। গ্রামের সাধারণ পরিবেশে থেকেও তিনি চিন্তার যে গভীরতা ধারণ করতেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই দেখি, মানুষ জ্ঞান অর্জন করছে, কিন্তু প্রজ্ঞা হারাচ্ছে। তথ্য বাড়ছে, কিন্তু মানবিকতা কমছে। এই সময়ের মধ্যে নাজিম স্যারের মতো মানুষরা ছিলেন এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ। তাঁরা প্রমাণ করতেন—একজন শিক্ষক শুধু পেশাজীবী নন; তিনি সমাজ নির্মাণের কারিগর।
মৃত্যু মানুষের চিরন্তন সত্য। কিন্তু কিছু মৃত্যু হৃদয়ের ভেতরে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি তোলে। নাজিম স্যারের মৃত্যু তেমনই এক বেদনার নাম। মনে হচ্ছে, গ্রামের আকাশ থেকে যেন এক পরিচিত আলোর প্রদীপ নিভে গেল। স্কুলের সেই গেট, গ্রামের সেই পথ, কিংবা কোনো বিকেলের নিস্তব্ধতা—সবকিছুতেই এখন তাঁর অনুপস্থিতি অনুভূত হবে।
তবু সান্ত্বনা একটাই—তিনি সম্মানের সঙ্গে বেঁচেছিলেন এবং ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? ছাত্রদের হৃদয়ে যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তিনি রেখে গেছেন, সেটিই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার।
আজ তাঁর বিদেহী আত্মার জন্য গভীর মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তাআলা জনাব নাজি উদ্দিন স্যারকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন, নূরে ভরিয়ে দিন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
আমরা যারা তাঁর ছাত্র ছিলাম, কিংবা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে তাঁর সংস্পর্শে এসেছি—তাঁদের হৃদয়ে নাজিম স্যার আজীবন বেঁচে থাকবেন। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যাবে, নতুন মানুষ আসবে, নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে; কিন্তু কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু উপদেশ কখনো হারিয়ে যায় না।
নাজিম স্যারও হারিয়ে যাবেন না।
তিনি থেকে যাবেন—
মমতাময় হাসিতে,
প্রেরণাদায়ী কথাতে

পাইনশাইল টু পিরুজালী গ্রামের স্মৃতিময় পথে,
আর তাঁর শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞ হৃদয়ে।

স্যারের স্নেহধন্য ছাত্র

মোঃ আলফাজ উদ্দিন

গণ সাংবাদিক ও নাগরিক লেখক

সম্পাদক-দৈনিক প্রান্তিক।