‘দলীয় পরিচয় নয়, ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচন করা যাবে’
নিজস্ব প্রতিবেদক-প্রান্তিক।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, দলীয় পরিচয় বা প্রতীক ব্যবহার না করলে এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর দলটির নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, এ বক্তব্য সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, “যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ, তাই আওয়ামী লীগের নাম, পদ-পদবি বা প্রতীক ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোনো ব্যক্তি যদি নির্দলীয় পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে চান এবং তিনি নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারেন, তাহলে তার অংশগ্রহণে আইনগত বাধা থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, “কেউ যদি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে এসে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রচারণা বা দলীয় বক্তব্য ব্যবহার করেন, সেটি সমস্যার সৃষ্টি করবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে একজন নাগরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ সংবিধান ও নির্বাচনী বিধানের মধ্যেই রয়েছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের এ অবস্থান একদিকে নিষিদ্ধ সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ না করার একটি বাস্তবধর্মী বার্তাও বহন করছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী লীগের সাবেক জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। তিনি জানান, তিস্তা অববাহিকায় ব্যারেজ বা রিজার্ভার নির্মাণে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে এবং বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে। তবে কোনো বিদেশি রাষ্ট্র সহযোগিতা করতে চাইলে সেই সুযোগও খোলা থাকবে।
তিস্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই প্রকল্প শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।”
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে ভারত থেকে ‘পুশইন’ ইস্যুতেও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার উদ্দেশ্যে নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই এসব পুশইনের ঘটনা ঘটছে। তবে বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একই সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন, তিস্তা ও সীমান্ত—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারের অবস্থান আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক প্রভাব পুরোপুরি কমে যায়নি। ফলে স্বতন্ত্র পরিচয়ে সাবেক নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে—কারণ দলীয় পরিচয় আড়াল করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হলে তা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এখন রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে, আর কতটা নতুন পরিচয়ে নির্বাচনী মাঠে ফিরে আসবে তারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক-প্রান্তিক। 




















