Dhaka ০৪:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জবি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রকাশ্য কর্মসূচি

‘৬ দফা’ ঘিরে নতুন করে উত্তপ্ত ছাত্ররাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক-প্রান্তিক

রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে আবারও প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় গেটের সামনে মানববন্ধন করে সংগঠনটির পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে ৬ দফা দাবি। মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের ছবি সংবলিত পোস্টার বহন করেন। কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের ব্যানারে প্রকাশ্যে স্লোগান দেওয়া হয় এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়।

ছয় দফা দাবির মধ্যে ছিল—সারা দেশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহিষ্কারাদেশ বাতিল, ‘রাজবন্দিদের’ নিঃশর্ত মুক্তি, কোটা আন্দোলনের নামে দলীয় নিয়োগ বন্ধ, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার এবং শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে হামের টিকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ফাঁসির দাবিও জানানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন জবি শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আশিক-ই-আতাহার মেসবাহ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান। এ সময় আশিক-ই-আতাহার মেসবাহ দাবি করেন, “ঐতিহাসিক ৬ দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। সেই চেতনা থেকেই বর্তমান ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।” তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষকরা হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন।

অন্যদিকে, জবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম ফরাজি বলেন, “ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। জবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন প্রক্টর।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগঠনটির বিচ্ছিন্ন উপস্থিতি এখনও পুরোপুরি থামেনি। বিশেষ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পোস্টারিং, গোপন বৈঠক ও কর্মসূচির অভিযোগ একাধিকবার সামনে এসেছে। গত ২৯ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেট ও বিবিএ ভবন এলাকায় ছাত্রলীগের পোস্টার দেখা যাওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে জবি ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের ধারাবাহিক মানববন্ধন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বিশ্ববিদ্যালয়টির উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কয়েক মাস আগেও জকসু নির্বাচন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবিদাওয়া ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়টি জাতীয় আলোচনায় উঠে আসে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও ছাত্রলীগের প্রকাশ্য কর্মসূচি দেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মসূচি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

জবি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রকাশ্য কর্মসূচি

Update Time : ০৮:৪২:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

‘৬ দফা’ ঘিরে নতুন করে উত্তপ্ত ছাত্ররাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক-প্রান্তিক

রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে আবারও প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় গেটের সামনে মানববন্ধন করে সংগঠনটির পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে ৬ দফা দাবি। মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের ছবি সংবলিত পোস্টার বহন করেন। কর্মসূচিতে ছাত্রলীগের ব্যানারে প্রকাশ্যে স্লোগান দেওয়া হয় এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়।

ছয় দফা দাবির মধ্যে ছিল—সারা দেশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহিষ্কারাদেশ বাতিল, ‘রাজবন্দিদের’ নিঃশর্ত মুক্তি, কোটা আন্দোলনের নামে দলীয় নিয়োগ বন্ধ, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার এবং শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে হামের টিকার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ফাঁসির দাবিও জানানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন জবি শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আশিক-ই-আতাহার মেসবাহ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান। এ সময় আশিক-ই-আতাহার মেসবাহ দাবি করেন, “ঐতিহাসিক ৬ দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। সেই চেতনা থেকেই বর্তমান ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।” তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষকরা হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন।

অন্যদিকে, জবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম ফরাজি বলেন, “ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। জবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন প্রক্টর।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগঠনটির বিচ্ছিন্ন উপস্থিতি এখনও পুরোপুরি থামেনি। বিশেষ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পোস্টারিং, গোপন বৈঠক ও কর্মসূচির অভিযোগ একাধিকবার সামনে এসেছে। গত ২৯ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেট ও বিবিএ ভবন এলাকায় ছাত্রলীগের পোস্টার দেখা যাওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে জবি ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের ধারাবাহিক মানববন্ধন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বিশ্ববিদ্যালয়টির উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কয়েক মাস আগেও জকসু নির্বাচন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবিদাওয়া ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়টি জাতীয় আলোচনায় উঠে আসে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও ছাত্রলীগের প্রকাশ্য কর্মসূচি দেশের ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মসূচি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।