“এই ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে” — বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার-প্রান্তিক।
দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠেছে। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “ইসলামী ব্যাংক কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।”
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকটির মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়ম ও জবরদস্তি চলেছে, তা শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জোরপূর্বক ও প্রভাব খাটিয়ে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি অবিলম্বে প্রকৃত মালিকদের কাছে সেই শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাংকের নেতৃত্বে আনার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ব্যাংকটির ঋণ বিতরণ, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আমানত ব্যবস্থাপনা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের ঋণ ঝুঁকি, স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়মের বিষয় উঠে আসে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “ইসলামী ব্যাংক আস্থার একটি পিরামিড। এই পিরামিড ধসে পড়লে পুরো ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ অনাস্থা তৈরি হবে।” তিনি দাবি করেন, হজ পালনে সৌদি আরব সফরের সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকেও ব্যাংকটি নিয়ে উদ্বেগের কথা শুনেছেন। তার ভাষায়, “রেমিট্যান্স প্রবাহ যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?”
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় মাত্র চার দিনে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্যের সত্যতা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো বিবৃতি দেয়নি, তবে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও আমানতকারীদের উদ্বেগ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে।
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট আমলে ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ১০ হাজার কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার দাবি, কোনো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই এবং পরীক্ষাবিহীনভাবে এসব নিয়োগ সম্পন্ন হয়। পরে নতুন প্রশাসনের সময়ে পুনরায় পরীক্ষার আয়োজন করা হলেও অধিকাংশ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাতে অংশ নেননি।
এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বক্তব্যেরও জবাব দেন তিনি। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী তহবিলে ইসলামী ব্যাংকের ঋণের অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে। এর জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “যদি এর দ্বারা জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়ে থাকে, তবে আমি প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি—এটি প্রমাণ করতে পারলে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মেডেল দেব।”
তিনি আরও বলেন, “কার ছেলে, কার নাতি—এসব বিবেচনা না করে, যে-ই দুর্নীতি করে থাকুক, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমি শফিকুর রহমান হলেও যেন ছাড় না পাই।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় আমানতভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। গ্রাহকসংখ্যা, প্রবাসী আয় সংগ্রহ এবং ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে ব্যাংকটির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বেশি। ফলে এই ব্যাংককে ঘিরে যেকোনো অস্থিরতা পুরো আর্থিক খাতে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমে বলেছেন, বড় ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হলে আমানত প্রত্যাহার প্রবণতা বাড়ে, যা সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত উত্তোলনে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বেড়েছে।
সংসদে বক্তব্যের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “পূর্বধারণা থেকে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে ইসলামী ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যাংকটি তার আগের অবস্থানে ফিরে এলে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে।”
বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাত খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপসহ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক ও উদ্বেগ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
স্টাফ রিপোর্টার-প্রান্তিক। 
















